ফেডের ওপর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপ

বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতি স্বাধীনতা নিয়ে শঙ্কিত গভর্নররা

ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মুদ্রানীতিসহ নানা বিষয়ে ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের ওপর ক্রমেই চাপ বাড়িয়ে তুলছেন তিনি। এ অবস্থায় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃত ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনভাবে নীতি প্রণয়ন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বৈশ্বিক আর্থিক খাতের বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা। বর্তমানে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, অন্যান্য দেশেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি প্রণয়নের স্বাধীনতা রাজনৈতিক চাপে খর্ব হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানদের মধ্যে কেউ কেউ এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন। খবর রয়টার্স।

যুক্তরাষ্ট্রে ফেডের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বিষয়টি আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত। আবার সংস্থাটির বোর্ড সদস্যরাও দীর্ঘদিনের জন্য নিয়োগ পেয়ে থাকেন। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অভিযোগ রয়েছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই জেরোম পাওয়েলকে পদত্যাগে বাধ্য করতে ব্যাপক চাপের মুখে রেখেছেন তিনি। এছাড়া আরেক বোর্ড সদস্য লিসা কুককেও পদত্যাগ করার জন্য প্রকাশ্যেই বেশ চাপের মুখে রেখেছেন ট্রাম্প।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ফেড যদি চাপের কাছে নতি স্বীকার করে অথবা ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি সংস্থাটির গভর্নরদের অপসারণের জন্য কোনো কৌশল খুঁজে বের করতে পারেন, তবে তা গোটা বিশ্বের জন্যই বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে। যেসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করতে পারে, হুমকির মুখে পড়তে পারে তারাও।

জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুন্দেসব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য জোয়াকিম নাগেলের ভাষ্যমতে, ‘ফেডের পরিস্থিতি মনে করিয়ে দিচ্ছে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত হিসেবে ধরে নেয়া এখন আর ঠিক হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে এখন তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। একই সঙ্গে এ-ও স্পষ্ট করতে হবে যে মূল্য স্থিতিশীলতা রক্ষায় অপরিহার্য শর্ত হলো স্বাধীনতা।’

তবে ফেড নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি প্রণয়নে সরকারি হস্তক্ষেপের প্রথম উদাহরণ নয়। জাপানে শিনজো আবে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে মূল্যসংকোচন মোকাবেলায় যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেয়ার অভিযোগ তুলে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব জাপানের (বিওজে) ওপর ব্যাপক মাত্রায় চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। তার সমালোচনার মুখে ২০১৩ সালে বিওজের তৎকালীন গভর্নর মাসাকি শিরাকাওয়া পদত্যাগ করেন। তবে শিরাকাওয়ার পদত্যাগের কয়েক সপ্তাহ আগেই হারুহিকো কুরোদাকে এ পদের জন্য মনোনীত করেছিলেন শিনজো আবে। পরে হারুহিকো কুরোদার নেয়া পদক্ষেপ ইয়েনের অবমূল্যায়ন ঘটিয়ে দেশটিতে প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দেখাতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে জাপান সরকারের প্রধান ঋণদাতা হয়ে ওঠে বিওজে।

শিনজো আবের মতো জেরোম পাওয়েলের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রকাশ্যে তার উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পও। এ বিষয়ে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে শিনজো আবের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।’

বর্তমানে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসিবিও। সংস্থাটির স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ইইউর সদস্যদেশগুলোর চুক্তির মাধ্যমে সুরক্ষিত। তা সত্ত্বেও ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকটিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ব্যাপক মাত্রায় রাজনৈতিক চাপ মোকাবেলা করতে হয়েছে। ইউরোপে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি প্রতিরোধে বছর দশেক আগে বিপুল পরিমাণ সরকারি বন্ড কিনেছিল ইসিবি। এ পদক্ষেপ সরকারকে অর্থায়নের সমতুল্য অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক দলগুলো ইসিবিকে আদালতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। ইতালি, জার্মানি ও ফ্রান্সের বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বিভিন্ন সময় ইসিবিকে নিয়ে সমালোচনায় মুখর হয়েছে।

ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্যের জ্যাকসন হোলে ফেডের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় গত শুক্রবার। এতে উপস্থিত ছিলেন ফিনল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব ফিনল্যান্ডের গভর্নর এবং ইসিবির অন্যতম নীতিনির্ধারক অলি রেন। তিনি বলেছেন, ‘ফেডের ওপর করা রাজনৈতিক আক্রমণের ধাক্কা ইউরোপসহ গোটা বিশ্বেই অনুভূত হচ্ছে।’

অনেকটা চাপের মুখেই জ্যাকসন হোল সম্মেলনে সেপ্টেম্বরে সুদহার কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন জেরোম পাওয়েল।

অলি রেনসহ আরো অনেকেই এখন ফেড চেয়ারম্যানের পক্ষে মতামত দিয়ে চলেছেন। সম্মেলনে অংশ নেয়া ডজন খানেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকারের মতে, ফেড যদি সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা হারায় এবং সংস্থাটির মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরির পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। কারণ এতে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এরই মধ্যে তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা ব্যাংকগুলোকে ডলার-সংশ্লিষ্ট ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করছে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক স্থানেই চার দশক আগে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সাবেক ফেড চেয়ারম্যান পল ভোলকারের নেয়া কর্মপদ্ধতি এখনো অনুসরণ করা হচ্ছে। ফেডের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা ও মূল্যস্ফীতিকে ২ শতাংশের কাছাকাছি আটকে রাখার নীতিও অনুসৃত হচ্ছে।

পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের সিনিয়র ফেলো ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মৌরি অবস্টফেল্ডের মতে, ‘একসময় যুক্তরাষ্ট্রকে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ও আইনের শাসনের ঘাঁটি হিসেবে ধরা হতো। সেখানে ফেড দখলের মতো ঘটনা অন্যান্য দেশের সরকারগুলোর জন্য ভয়াবহ উদাহরণ তৈরি করবে।’

আরও